কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি: সরকারি চাকরি—হাজারো পরিবারের বেঁচে থাকার স্বপ্ন, বহুদিনের জমানো কষ্ট আর দীর্ঘশ্বাস ঘোচানোর প্রত্যাশা। কিন্তু বেকারত্বের ভারে যখন তরুণদের স্বপ্ন বারবার থমকে যায়, তখন অনেকেই চাকরির আশায় প্রতারণার ফাঁদে পড়েন। আর সেই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে একটি চক্র চাকরি দেওয়ার কথা বলে অর্থ হাতিয়ে নেয়—এমনই চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলায়। অভিযোগ উঠেছে, পুলিশের চাকরি দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে ভুক্তভোগী পরিবারের কাছ থেকে কয়েক ধাপে লাখ লাখ টাকা নেওয়া হয়েছে। অভিযোগের সঙ্গে ফুলবাড়ী উপজেলা জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-এর যুগ্ম সদস্য সচিব খলিলুর রহমান, কুড়িগ্রাম জেলা এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক মাহমুদুল হাসান জুয়েল এবং নাগেশ্বরী উপজেলা এনসিপির আহ্বায়ক আলমগীর হোসেনের নাম উঠে এসেছে। ভুক্তভোগী মোহাম্মদ নাইম ইসলামের ভগ্নিপতি হাফিজুল মিয়ার সঙ্গে খলিলুর রহমানের একটি চুক্তি হয় বলে অভিযোগ। সেখানে বিশেষ কোটায় পুলিশের চাকরি নিশ্চিত করে দেওয়ার কথা বলা হয়। এজন্য নাইমের পরিবারের কাছে মোট ১৬ লাখ টাকা দাবি করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। চুক্তির অংশ হিসেবে তিন ধাপে নগদ সাড়ে ৭ লাখ টাকা নেওয়া হয় বলে দাবি ভুক্তভোগী পরিবারের। অভিযোগের সবচেয়ে আলোচিত দিক হলো—এই অর্থ লেনদেনের একটি অংশ ফুলবাড়ীর কাচারী মাঠের একটি মসজিদের বারান্দায় হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। এ ঘটনার একটি ভিডিও ফুটেজও রয়েছে বলে জানা গেছে। লেনদেনের সময় উভয় পক্ষের মধ্যে বিশ্বাসযোগ্যতা নিশ্চিত করতে নিজেদের নামে থাকা দুটি করে ব্যাংক চেক এবং ১০০ টাকার তিনটি ফাঁকা স্বাক্ষরিত স্ট্যাম্প জামানত হিসেবে রাখা হয়েছিল বলেও অভিযোগ রয়েছে। এই লেনদেনের সাক্ষী হিসেবে স্থানীয় ১ নম্বর ওয়ার্ড জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি সোহরাব হোসেনের নাম আসে। তার বক্তব্য অনুযায়ী, নামাজ শেষে মসজিদ থেকে বের হওয়ার পর তাকে বৈঠকে বসানো হয় এবং সেখানে লেনদেনের বিষয়টি তাকে জানানো হয়। অভিযোগের বিষয়ে হাফিজুল মিয়া জানান, টাকা নেওয়ার পর চাকরির ব্যবস্থা করার কথা বলে তাদের ঢাকায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে দালালচক্রের হাতে পড়ে তারা বিপাকে পড়েন। একপর্যায়ে আতঙ্কের মধ্যে নাইমকে নিয়ে তারা ফিরে আসেন। এ সময় নাইমের এসএসসি ও এইচএসসির মূল সনদ ঢাকায় থেকে যায় বলে দাবি করা হয়েছে। পরবর্তীতে ভুক্তভোগী নাইমের বাড়িতে গিয়ে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে অনুসন্ধান চালানো হয়। ক্যামেরার সামনে কথা বলতে রাজি না হলেও নাইম অভিযোগ করেন, স্থানীয় সংসদ সদস্যের নাম ব্যবহার করে তাকে চাকরি দেওয়ার আশ্বাসে টাকা নেওয়া হয়েছিল। নাইমের আরও দাবি, ঢাকার দালালদের কাছ থেকে ফিরে আসার পর এনসিপি নেতা মাহমুদুল হাসান জুয়েল ঢাকায় গিয়ে তার শিক্ষাগত সনদগুলো উদ্ধার করে দেন। পরিবারের পক্ষ থেকে টাকা ফেরতের জন্য চাপ দেওয়ার পর মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে কিছু টাকা ফেরত দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করা হয়। তবে এখনও ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা পাওনা রয়েছে বলে ভুক্তভোগী পরিবারের দাবি। আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে ওই টাকা পরিশোধের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে বলেও তারা জানান। এদিকে অনুসন্ধানের সময় ছাত্রশক্তির সদস্য সচিব আজাদ আহমেদ শাওনের সঙ্গে কথা হলে তিনি দাবি করেন, কারও প্রত্যক্ষ ইন্ধন ছাড়া খলিলুর রহমানের পক্ষে এত বড় অঙ্কের টাকা লেনদেন করা সম্ভব নয়। এ সময় তিনি ফুলবাড়ী উপজেলা এনসিপির আহ্বায়ক নাজমুল ফেরদৌস লাবলু ও সদস্য সচিব আব্দুল লতিফের দিকে ইঙ্গিত করেন। পাশাপাশি কুড়িগ্রাম জেলা এনসিপির আহ্বায়ক মুকুল ও সদস্য সচিব মাসুম মিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের যোগাযোগ রয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি। অন্যদিকে, অভিযোগের বিষয়ে নাগেশ্বরী উপজেলা এনসিপির আহ্বায়ক ও অভিযুক্ত আলমগীর হোসেনের বক্তব্য নেওয়া হয়। প্রতিবেদনে প্রচারিত বক্তব্য অনুযায়ী, তিনি ঘটনার সঙ্গে নিজের সম্পৃক্ততার বিষয়ে কথা বলেন এবং ভুক্তভোগীরা বিষয়টি নিয়ে বেশি বাড়াবাড়ি করলে তাদের বিপদের আশঙ্কা রয়েছে—এমন বক্তব্য দেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। তবে অভিযোগগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য, অর্থ লেনদেনের নথি, ভিডিও ফুটেজ এবং অন্যান্য প্রমাণ যাচাই করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো প্রয়োজন। অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগকে অভিযোগ হিসেবেই বিবেচনা করা উচিত।