হ্যালো নিউজ ডেস্ক: জনপ্রিয় কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মোহাম্মদ মুক্তাদিরের BrownFish Studio-তে হামলা, ব্যাপক ভাঙচুর ও সরঞ্জাম লুটের অভিযোগ উঠেছে। ২৬ সেপ্টেম্বর শনিবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে রাজধানীর ইসিবি চত্বরসংলগ্ন দক্ষিণ মানিকদীর একটি আবাসন প্রকল্পে ঘটনাটি ঘটে। স্টুডিওটি ওই প্রকল্পের একটি ভবনের নিচতলায় অবস্থিত।
ঘটনার পর ২৭ সেপ্টেম্বর রাত ১টা ৩৩ মিনিটে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে ভিডিও প্রকাশ করেন সালমান। ভিডিওতে স্টুডিওর ভাঙা আসবাব, ক্ষতিগ্রস্ত ক্যামেরা ও আলো, ছড়িয়ে থাকা যন্ত্রপাতি এবং বিধ্বস্ত সেট দেখা যায়। তিনি জানান, হামলায় তার কোনো কর্মী শারীরিকভাবে আহত হননি; তবে কর্মীদের অনেকে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন।
প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনায় যা জানা যাচ্ছে
হামলার সময় উপস্থিত একজন কেয়ারটেকারের ভাষ্য অনুযায়ী, আনুমানিক ১০০ থেকে ১৫০ জনের একটি দল জোর করে প্রকল্পে ঢোকে। এই সংখ্যা প্রত্যক্ষদর্শীর অনুমান; পুলিশ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে হামলাকারীর সংখ্যা নিশ্চিত করেনি। অনেকের মুখ ঢাকা ছিল এবং কারও কারও হাতে আগ্নেয়াস্ত্র, ধারালো অস্ত্র ও দেশীয় অস্ত্র ছিল বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শীর দাবি, হামলাকারীরা স্টুডিওর শাটার ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে ক্যামেরা, সিসিটিভি, আসবাব ও অন্যান্য উৎপাদন সরঞ্জাম ভাঙচুর করে এবং কিছু মালামাল নিয়ে যায়। দুই কেয়ারটেকার শৌচাগারে আশ্রয় নিলেও তাদের ভয় দেখিয়ে মোবাইল ফোন ও মানিব্যাগ নেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগের প্রতিটি দিক তদন্তে যাচাই হওয়া প্রয়োজন।
সালমান কি সরাসরি লক্ষ্য ছিলেন?
ঘটনার সময় সালমান ঢাকার বাইরে চট্টগ্রামে ছিলেন। খবর পেয়ে তিনি ঢাকায় ফিরে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। সাংবাদিকদের কাছে তিনি বলেন, হামলাটি শুধু তার স্টুডিওতে সীমাবদ্ধ ছিল না; আবাসন প্রকল্পের একাধিক অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ কারণে তার ধারণা, তিনি ব্যক্তিগতভাবে হামলার মূল লক্ষ্য ছিলেন না এবং হামলাকারীরা স্টুডিওটি তার—এ তথ্যও হয়তো জানত না।
সালমানের ভাষ্য, ব্যক্তিগতভাবে তার কাছে কেউ চাঁদা দাবি করেনি। তবে প্রকল্পের জমির মালিকের সঙ্গে চাঁদার দাবি নিয়ে বিরোধের কথা তিনি শুনেছেন এবং সেই বিরোধের প্রতিশোধ নিতে গিয়ে তার স্টুডিও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলে ধারণা করছেন। ঘটনার পেছনে স্থানীয় বিএনপি-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা থাকার অভিযোগও তিনি তুলেছেন। তবে এই রাজনৈতিক পরিচয় ও চাঁদাবাজির অভিযোগের পক্ষে এখনো স্বাধীনভাবে যাচাই করা চূড়ান্ত প্রমাণ প্রকাশিত হয়নি।
পুলিশ কী বলছে
ক্যান্টনমেন্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিনের ভাষ্য অনুযায়ী, জায়গা দখলকে কেন্দ্র করে বিরোধের জেরে ইসিবি এলাকার একটি অফিসে হামলা হয়েছে। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে এবং ছুরিসহ দুইজনকে আটক করে। ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে বলে তিনি জানিয়েছেন।
পুলিশের প্রাথমিক বক্তব্যে জমি দখলকেন্দ্রিক বিরোধের কথা বলা হলেও সালমান ও প্রত্যক্ষদর্শীরা চাঁদার দাবি প্রত্যাখ্যানের পর হামলার অভিযোগ করছেন। দুই বক্তব্যের এই পার্থক্য, হামলার পরিকল্পনাকারী কারা এবং আটক ব্যক্তিদের ভূমিকা—এসব প্রশ্নের উত্তর তদন্ত ও মামলার অগ্রগতির ওপর নির্ভর করছে।
কতটা ক্ষতি হয়েছে
BrownFish Studio-তে পেশাদার ক্যামেরা, আলো, রেকর্ডিং সরঞ্জাম, মডুলার ব্যাকড্রপ, সম্পাদনা সুবিধা এবং প্রায় ২৯টি সিসিটিভি ক্যামেরা ছিল বলে সালমান জানিয়েছেন। হামলায় সিসিটিভি ব্যবস্থা, আসবাব, প্রডাকশন সরঞ্জাম এবং তার YouTube Silver ও Gold Play Button ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কথাও জানানো হয়েছে।
এখনো ক্ষয়ক্ষতির আর্থিক হিসাব শেষ হয়নি। সালমান বলেছেন, তাৎক্ষণিকভাবে অর্থের হিসাবের চেয়ে কর্মীদের মানসিক অবস্থা ও নিরাপত্তাকে তিনি বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। পেশাদার সরঞ্জামের পাশাপাশি বহু বছরের শ্রমে গড়ে ওঠা একটি সৃজনশীল কর্মপরিসর নষ্ট হওয়াকেই তিনি বড় ক্ষতি হিসেবে দেখছেন।
কেন ঘটনাটি দ্রুত ভাইরাল হয়েছে
ভাঙচুরের দৃশ্য দেখিয়ে প্রকাশ করা সালমানের ভিডিও দ্রুত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে তার ক্ষোভ, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে উদ্দেশ করে ব্যঙ্গাত্মক মন্তব্য এবং কোনো রাজনৈতিক দলের তোষামোদ না করলে নিরাপত্তা পাওয়া কঠিন—এমন বক্তব্য নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে।
একই সঙ্গে ধ্বংসস্তূপের মধ্যেও তিনি আবার কাজ শুরু করা এবং আরও বড় কিছু নির্মাণের ঘোষণা দিয়েছেন। কর্মীদের সান্ত্বনা দিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার এই বার্তাও ভিডিওটি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ার অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
BrownFish Studio কেন গুরুত্বপূর্ণ
সালমান ও তার অংশীদারেরা ২০২৬ সালের এপ্রিলে স্টুডিওটি চালু করেন। এখানে পডকাস্ট, বিজ্ঞাপনচিত্র, ফটোশুট, প্রযুক্তি ও গাড়িবিষয়ক শুট, রিল, চলচ্চিত্র, পোর্টফোলিও এবং সংগীত প্রযোজনার সুবিধা ছিল। শিল্পী ও নির্মাতাদের জন্য মেকআপ রুম, পোস্ট-প্রডাকশন দল, বিভিন্ন সেট ও প্রপসসহ একাধিক সুবিধা এক জায়গায় দেওয়ার উদ্যোগ ছিল এটি।
এ কারণে ঘটনাটি শুধু একজন পরিচিত কনটেন্ট ক্রিয়েটরের সম্পত্তি নষ্ট হওয়ার খবর নয়; বেসরকারি সৃজনশীল শিল্প, ছোট প্রযোজনা দল এবং স্বাধীন নির্মাতাদের নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে। এমন একটি স্থাপনায় হামলার অভিযোগ ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ ও কর্মপরিবেশের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
যা এখনো নিশ্চিত নয়
হামলাকারীদের পূর্ণ পরিচয়, চাঁদার দাবি আদৌ কত টাকা ছিল, জমি নিয়ে বিরোধের প্রকৃতি, কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের সাংগঠনিক নির্দেশ ছিল কি না এবং মোট ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ—এসব এখনো নিশ্চিত নয়। সালমানের বক্তব্য, প্রত্যক্ষদর্শীর অভিযোগ ও পুলিশের প্রাথমিক তথ্যকে তাই তদন্ত শেষ হওয়ার আগে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
আটক দুইজনের বিরুদ্ধে কী অভিযোগ আনা হয়, মামলা হলে সেখানে কারা আসামি হন এবং ভিডিও বা সিসিটিভি ফুটেজ থেকে আর কাউকে শনাক্ত করা যায় কি না—এসব তথ্য সামনে এলে ঘটনার পূর্ণ চিত্র আরও পরিষ্কার হবে। নতুন নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া গেলে এই প্রতিবেদন হালনাগাদ করা হবে।





মন্তব্য